• হাইকু
  • টাঙ্কা
  • হাইবুন
  • পদ্য
  • কাব্য কাহিনী
  • মনেরকথা
  • কাব্য নাট্য
  • All Categories
  • Gallery
    • Publications
    • Videos

What are you looking for?

Main Menu

  • হাইকু
  • টাঙ্কা
  • হাইবুন
  • পদ্য
  • কাব্য কাহিনী
  • মনেরকথা
  • কাব্য নাট্য
  • All Categories
  • Gallery
    • Publications
    • Videos
গল্প

গল্প-ওয়াল্টজ 

Amitava Mukherjee
Amitava Mukherjee
5 Min Read
18 Views
0 Comments

ওয়াল্টজ 

অমিতাভ মুখোপাধ্যায়

কুয়াশাটা ময়দানের ঘাস থেকে উঠছিল ভিজে খড় পোড়ানো ধোঁয়ার মতো। নিচ থেকে উপরে। যেন মাটির তলায় কেউ একটা শীতকাল জ্বালিয়ে রেখেছে। রাত সাড়ে বারোটা। কার্জন পার্কের যে বেঞ্চটা ল্যাম্পপোস্টের ঠিক নিচে, সেই হলদে আলোর গোল বৃত্তের মধ্যে বসে বুড়িটা প্লাস্টিকের বোতল গুনছিল।

গোনা মানে ঠিক সংখ্যা নয়। এক-দুই-তিন বলে সে থামত। তারপর আবার এক থেকে শুরু করত। যেন প্রতিবার আগেরবারের হিসেব মুছে যাচ্ছে। বোতলগুলো একটা ছেঁড়া চটের ব্যাগে। ব্যাগের গায়ে কোনো এক পুজোর বিজ্ঞাপন। রং জ্বলে গিয়ে মুখগুলো ভূতের মতো হয়ে আছে।

নীলাঞ্জন আসে  রাত একটায় এবং সিগারেটের গন্ধ নিয়ে।

সন্ধেবেলা কফি হাউসে লিটল ম্যাগাজিনের আড্ডা ছিল।  তারপর কেউ একজন বলল খালাসিটোলা। তারপর কে যেন বলল হাঁটি। এবং হাঁটতে হাঁটতে বন্ধুরা একে একে কেটে গেছে ট্রাম লাইনের ধারে। অটোর ভিতরে। মেট্রোর শেষ ট্রেনে। 

এখন সে একা, পকেটে তিরিশ টাকা। বুকপকেটে ভাঁজ করা একটা কবিতা। যেটা কেউ শুনতে চায়নি।

সে বেঞ্চের এক কোণে বসে পড়ল।

তারপর গন্ধটা পেল। ভেজা ন্যাকড়া, কর্পূর, আর তার নিচে আরও পুরনো কিছু। বহুদিন বন্ধ থাকা আলমারির গন্ধ।

“ও মাসি।”

বুড়ি মুখ তুলল না। “উনআশি।”

“কী?”

“উনআশিটা বোতল। কাল বৃষ্টি হয়েছিল বলে লোকে জল খেয়েছে কম।”

নীলাঞ্জন হেসে ফেলল। “আপনি এখানে বসে আছেন কেন এত রাতে? বাড়ি নেই?”

“তুমি বসে আছ কেন?”

“আমি কবি।”

“ও।” বুড়ি একটা বোতল পায়ের তলায় ফেলে চটকে সমান করল। 

শব্দটা রাতের মধ্যে অস্বাভাবিক জোরে বাজল। 

“তার মানে তোমারও বাড়ি নেই।”

ছেলেটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। 

ট্রাম ডিপোর দিক থেকে একটা কুকুর ডেকে উঠল। তারপর থেমে গেল। যেন নিজের ডাকেই লজ্জা পেয়েছে।

“উঠুন না। এই বেঞ্চটা” সে হাত নেড়ে দেখাল, কী দেখাল নিজেও জানে না। 

“এই বেঞ্চটা প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্য। আপনি বসে থাকলে কেউ আসবে না।”

“কেউ আসবে না বলেই তো আমি বসি।” বুড়ি এবার প্রথমবার তাকাল।

চোখদুটো ছানিতে ঘোলা, কিন্তু ঘোলা কাচের ভিতর দিয়ে যেমন আলো আসে, তেমন কিছু একটা ছিল। 

“ওরা এসে বসে, ঘণ্টাখানেক ফিসফিস করে, তারপর চলে যায়। যাওয়ার সময় বোতল ফেলে যায়। আমার লাভ। কিন্তু ওদের লোকসান, বুঝলে? ওরা যা ফেলে যায় তার মধ্যে বোতলই সবচেয়ে সস্তা।”

“আপনার বয়স কত?”

“নিরানব্বই।”

“বাহ।”

“উনিশশো ছাব্বিশের অগ্রহায়ণ।” সে গুনতে শুরু করল আঙুলে, তারপর মাঝপথে ছেড়ে দিল। “তুমি হিসেব করে নাও, তোমাদের বয়সে হিসেব ভালো থাকে।”

নীলাঞ্জন হিসেব করল না। মদের ভিতর থেকে একটা বেপরোয়া কৌতুক উঠে আসছিল।

“নিরানব্বই বছর ধরে বেঁচে আছেন, আর আপনার শেষ কাজ কার্জন পার্কে বোতল কুড়োনো?”

“না, শেষ কাজ অপেক্ষা।” বুড়ি চটের ব্যাগের মুখ বাঁধল। “আমি অপেক্ষা করছি এমন একজনের জন্য যে আমাকে দেখে ‘সুন্দর’ বলবে না।”

“কেন?”

“কারণ যারা বলে, তারা মরে যায়।”

ছেলেটা এবার সত্যিই হাসল, মাথা পিছনে ফেলে, গলার হাড় দেখা গেল। 

“বাহ। এটা কবিতায় লিখব।”

“লিখো। আমি বারণ করি না। আগেরজনও লিখেছিল।”

কুয়াশাটা তখন হাঁটুসমান উঠে এসেছে। ভিক্টোরিয়ার পরীটা দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু তার দিকে চোখ গেলে মনে হচ্ছিল কেউ ওখানে দাঁড়িয়ে আছে, ঘুরছে না, শুধু দাঁড়িয়ে আছে।

“আগেরজন কে?”

বুড়ি অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। এত ক্ষণ যে নীলাঞ্জন ভাবল প্রশ্নটা বোধহয় সে করেনি, ভেবেছিল মাত্র।

“ছেচল্লিশের ফেব্রুয়ারি,” সে বলল। “পার্ক স্ট্রিটে ফিরপোজ। তুমি চেনো না।”

“নাম শুনেছি। এখন তো ওখানে—”

“চুপ করো।” আশ্চর্য, গলায় ধমক নেই, শুধু ক্লান্তি। “তুমি জানো ওখানে এখন কী আছে, আমি জানি ওখানে কী ছিল। দুটো আলাদা জায়গা। একসঙ্গে বললে দুটোই নষ্ট হয়।”

সে ব্যাগটা কোলের উপর তুলে নিল।

“কাচের ঝাড়লণ্ঠন ছিল সাতটা। ব্যান্ড বাজাতো গোয়ানিজ ছেলেরা, ট্রাম্পেটে যে ছেলেটা, তার নাম ছিল কার্ভালো, রোগা, চশমা পরত। 

মেঝেটা ছিল কাঠের, আর হিলের নিচে কাঠ এমন শব্দ করত যেন কেউ দূরে দরজা বন্ধ করছে। আমার শাড়িটা ছিল হালকা সোনালি, ঢাকাই, ঠাকুমার।

জ্যেঠামশাই ইম্পিরিয়াল ব্যাঙ্কে ছিলেন, তাই নেমন্তন্ন পেয়েছিলাম। আমার বয়স তখন উনিশ।

“ও ছিল সিভিলিয়ান। দেবব্রত। বাঁ চোখের নিচে একটা ছোট কাটা দাগ, ছেলেবেলায় নাকি গোরুর গাড়ি থেকে পড়ে গিয়ে। 

বাইরে তখন শহর জ্বলছে, তুমি বইয়ে পড়েছ নিশ্চয়ই। মিছিল, লাঠি, ট্রাম প্রায় উল্টে দেওয়া। 

কিন্তু ভিতরে ব্যান্ড বাজছে। এইটাই আমি তোমাকে বোঝাতে চাই, কবি। ভিতরে ব্যান্ড বাজছিল। মানুষ এমনই।

“শেষ ওয়াল্টজে ও আমার কোমরে হাত রাখল, আর নিচু গলায় বলল—”

বুড়ি থামল।

“কী বলল?”

“যা তুমি এখুনি বলবে না।”

নীলাঞ্জন টের পেল তার ঘাড়ের রোঁয়া দাঁড়িয়ে গেছে। এবং সঙ্গে সঙ্গে নিজের উপর বিরক্ত হল। 

মদ, শীত, আর গল্প — এই তিনটে মিশলে যে-কোনো মূর্খ ভূত দেখতে পারে।

“তারপর?”

“তারপর ভোরবেলা ও হেঁটে ফিরছিল ধর্মতলার দিকে। বৌবাজারের মোড়ে ভিড়ের মধ্যে পড়ল। কেউ জিজ্ঞেস করেনি ও কে, কোন দিকের। জিজ্ঞেস করার সময় ছিল না তখন।” 

সে বোতলের ব্যাগে হাত বোলাল, ঠিক যেমন কেউ ঘুমন্ত বাচ্চার পিঠে হাত রাখে। 

“আমি সাতাত্তর বছর ধরে ভাবছি — ও যদি কথাটা না বলত, তাহলে হয়তো একটু আগে বেরোত, কিংবা একটু পরে।”

দূরে ময়দানের ভিতর দিয়ে একটা ঘোড়া হেঁটে যাচ্ছিল, সহিস নেই, নিজে নিজেই। খুরের শব্দ কুয়াশায় নরম হয়ে আসছিল।

“আপনি সত্যি বিশ্বাস করেন যে ওই কথাটার জন্য—”

“আমি কিছু বিশ্বাস করি না।” বুড়ি এবার সোজা হয়ে বসল, আর আশ্চর্য, তার মেরুদণ্ড সোজা হতে জানত।

“আমি শুধু গুনি। একজন, দুজন, তিনজন। উনিশশো একষট্টিতে একজন ফিল্মের লোক, পার্ক সার্কাসে। 

চুরাশিতে একজন ডাক্তার, নিজের চেম্বারে, রাত্তিরবেলা। 

দুহাজার নয়ে একটা ছেলে, তোমার মতোই, গিটার বাজাত। 

সব্বাই ওই একই কথা বলেছিল। কেউ দুবার বলার সুযোগ পায়নি।”

নীলাঞ্জন উঠে দাঁড়াতে গেল। পারল না। পা দুটো ভারী, যেন কেউ নিচে থেকে চেপে ধরে আছে। পরে সে ভাবল, ওটা শুধু মদ।

তখনই সে খেয়াল করল, ল্যাম্পপোস্টের আলোটা আর হলদে নেই। সাদা। এবং একটা নয়, অনেকগুলো, উপরের দিকে, ঝুলন্ত, কাচের ফোঁটার মতো। 

বাতাসে ন্যাকড়ার গন্ধ কেটে গিয়ে এসেছে গরম মোম, ফরাসি সেন্ট আর ভাজা মাছের গন্ধ। 

ট্রামের ঘটাং নয় — ট্রাম্পেট। রোগা একটা ছেলে চশমা ঠিক করে নিয়ে ফুঁ দিচ্ছে, চোখ বন্ধ।

মেঝেটা কাঠের। মেঝেটা সত্যিই কাঠের।

বেঞ্চে তার পাশে যে বসে আছে তার শাড়ির আঁচল কোলের উপর, হালকা সোনালি, আর কুয়াশার মধ্যে সেটাই একমাত্র জিনিস যেটা আলো ফিরিয়ে দিচ্ছে।

“আমার হাতটা ধরো,” সে বলল। “ওয়াল্টজে হাতটা নিচে নয়, একটু উঁচুতে। তোমরা এখন সব ভুলে গেছ।”

নীলাঞ্জন হাত বাড়াল। আঙুলগুলো ঠান্ডা, কিন্তু নরম নয় — শক্ত, জীবিত, কড়া-পড়া।

তারা ঘুরল। একবার, দুবার। ঘাসের উপর, কুয়াশার ভিতর, পিছনে সাতটা ঝাড়লণ্ঠন এবং তার পিছনে একটা শহর যেটা তখন জ্বলছে আর এখনও জ্বলছে, শুধু ধোঁয়াটা অন্যরকম।

ছেলেটার বুকের ভিতর কবিতাটা ভাঁজ খুলে যাচ্ছিল।

সে বলতে চাইল — অসাধারণ, অপরূপ, বিস্ময়কর। 

শব্দগুলো তার পেশা, তার সম্বল, সে সারাজীবন শব্দ নিয়ে ঘুরেছে যেভাবে বুড়ি বোতল নিয়ে ঘোরে। 

কিন্তু যা বেরোল তা সবচেয়ে সস্তা, সবচেয়ে ব্যবহৃত, রাস্তায় পড়ে থাকা একটা কথা, যেটা তুলে নিলে হাতে কিছুই থাকে না।

“আপনি সুন্দর।”

ঘোরাটা থেমে গেল।

কার্ভালো ট্রাম্পেট নামাল না, শুধু বাজানো বন্ধ করল, মাঝখানে, একটা অসমাপ্ত নোটে।

আলোগুলো আবার হলদে হয়ে গেল, একটা, শুধু একটা, মাথার উপরে, তার ভিতরে পোকা ঘুরছে।

নীলাঞ্জন বেঞ্চে বসে পড়ল, তারপর একটু হেলে গেল, তারপর তার মাথাটা পিঠের কাঠে ঠেকল, ঠিক যেভাবে মাতালরা ঘুমোয়।

বুড়ি অনেকক্ষণ বসে রইল।

তারপর হাত বাড়িয়ে ছেলেটার বুকপকেট থেকে ভাঁজ করা কাগজটা বার করল, চোখের কাছে নিয়ে গেল, দূরে সরাল, আবার কাছে নিল। 

পড়তে পারল না — চশমাটা কোন সালে হারিয়েছে মনে নেই। কাগজটা সে আবার ভাঁজ করে ছেলেটার পকেটে ঢুকিয়ে দিল, ঠিক জায়গায়, যাতে পুলিশ পেলে বুঝতে পারে এটা তারই।

তারপর ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল।

ভোর পাঁচটায় কর্পোরেশনের সাফাইয়ের গাড়িটা এল। একটা লোক ঝাঁটা হাতে নেমে এসে বেঞ্চের দিকে তাকাল, নাক কুঁচকোল, তারপর ডাকল, “ও দাদা, ঘরে যান।” সাড়া পেল না। আরও একবার ডাকল।

কিছুটা দূরে, ঘাসের উপর, সাদা চুলের একটা বুড়ি হেঁটে যাচ্ছিল ট্রাম ডিপোর দিকে, পিঠে ছেঁড়া চটের ব্যাগ, ব্যাগের ভিতরে বোতলগুলো একে অপরের গায়ে লেগে ঠুকঠুক শব্দ করছিল।

সে গুনছিল।

“উনআশি,” সে বলল। “আশি।”

কুয়াশা তখন নামছিল, উঠছিল না। 

শহরের কোথাও একটা প্রথম ট্রাম চলতে শুরু করল। 

আর সেই শব্দে, খুব ক্ষীণভাবে, একটা অসমাপ্ত নোট শেষ হল।

অগস্ট ২০২৬

Copyright:অমিতাভ মুখোপাধ্যায়

Illustration: সুমিত সান্যাল

Branding: কৌশিক ভট্টাচার্য

এই গল্পটি প্রকাশিত হয়েছে অনলাইন পত্রিকা ঋতবাক সেপ্টম্বর সংখ্যায়

লিঙ্কঃ

https://rritobak.blogspot.com/2026/09/blog-post_891.html

Please share this article if you like it!

Link Copied!
Amitava Mukherjee
Written By

Amitava Mukherjee

Academician and Writer

Other Articles

Previous

নাট্য সংলাপ-উমা আসছে বছর বছর

No Comment! Be the first one.

Leave a Reply Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe to our newsletter

Get latest updates, offers and news directly in your inbox.

All Right Reserved! Concept: Kaushik Bhattacharyya, Illustrations: Sumit Sanyal