রবি ঠাকুরের কণ্ঠস্বরের রেকর্ডিং

তার কথা শুনতে পাবো, তা আশা করিনি। আমি পার্ক স্ট্রীটের মোড়ের লাল বাতিতে দাঁড়িয়ে আছি মরিয়া হয়ে। রোজের মতো কাজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে। ভাঙা মেরুদণ্ডটা এমনভাবে দপদপ করছে যেন ওটা শরীরের মধ্যে নেই। হৃৎপিণ্ডকে ধরে রেখেছে, কোলকাতার এই অংশটুকুতে। সাম্প্রতিক নভেম্বরের উষ্ণ আবহাওয়ার মতোই অপ্রত্যাশিত।
কিন্তু এই যে তিনি, তাঁর সরু গলাও আর কিছুটা ক্লান্ত। তাঁর মিহি উচ্চারণটা দীর্ঘায়িত হয়ে আসছে। যখন তিনি শব্দগুলো উচ্চারণ করছেন, বাংলা শব্দ... প্রতিধ্বনিতে আর স্মৃতিতে পূর্ণ। এমন সব অনুষঙ্গে যার যার নাম, তিনি উল্লেখ করছেন না। তার মুখে এখনও ১৯৩৭ সাল... এবং পরে আমি জানতে পারি যে তিনি আসলে কথাই বলছেন না। কোলকাতার আকাশবাণীর অনুষ্ঠানের একটি বক্তৃতা প্রচারিত হচ্ছে। স্ক্রিপ্টটি তার সামনে ধরা, যেন তার লম্বা, সাদা হাতে আলোর একটি ফলক। মাথার ভেতরের একটি জানলায় তার কণ্ঠস্বর শুনতে পাই। ধীরস্থির শব্দচয়নে যেন শব্দ আর সেই অনুষঙ্গের প্রতি এক শোকগাথা। যেভাবে তিনি বহু শতাব্দী ধরে মানুষের মুখে, ঘরেতে, রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। টেপের হিসহিস আর খসখস শব্দের মধ্য দিয়ে সময় বয়ে গেছে।
যখন তাঁকে স্টুডিওতে কল্পনা করি, হয়তো তিনি একটু উদ্বিগ্ন ছিলেন। কোনো মহিলা কালো খোঁপায়, সেজেগুজে, যদিও কেউ তাকে দেখছে না। যদিও বহু বছর পরে তার ভাগ্নে রেকর্ডিংটিকে বর্ণনা করবে বড্ড দ্রুত, বড্ড নিষ্প্রাণ, প্রায় চেনার অযোগ্য হিসেবে। তাঁর সুন্দর কণ্ঠস্বর (যদিও অতটা সুন্দর নয়), সমস্ত অনুরণনে আর গভীরে। কেবল বাঙালি মস্তিষ্কে তাঁর কথাগুলো সেই ধ্বনিতে তৈরি হতো। যখন শুয়ে থাকতাম...কলেজের হস্টেলের সরু বিছানাযয়। প্রথম নভেম্বরে। ‘ঘরে বাহিরে’ বইয়ের পাতায় একের পর এক বাক্যাংশে দাগ...গাঢ় লাল কালিতে দাগ দিতাম। এইজন্য নয় যে বুঝতাম...সেগুলোর অর্থ কী। বরং সেগুলো শুনতে ভালো লাগতো...উচ্চস্বরে। আর শিক্ষিকার অফিসে তাঁর একটা ছবি টাঙানো ছিল।
মা মারা যাওয়ার পর, প্রথম যে জিনিসটা ভুলে গেলাম...তাঁর কণ্ঠস্বর, সেটাকে ধরে রাখার মতো কিছুই নেই। কেবল এক-দু মুহূর্ত ছাড়া... যে পটভূমিতে কথা বলেছেন..."এখন নয়, এখন নয়”। যেন কোনো সময়ই কখনো সঠিক হবে না, এমনকি...। সেই ছেঁড়া অংশটুকুও অতীতের কোথাও হারিয়ে যায়। যদিও মনে পড়ে রবি ঠাকুরের গান শুনতে শুনতে, তাঁর কণ্ঠস্বর—যা একেবারেই সুচেতা সান্যালের মতো নয়, যে কণ্ঠস্বরের সাথে অভ্যস্ত হতে “কিছুটা সময় লাগবে”। রবি-গবেষক বন্ধুটি তাই বলে।
আট মিনিট ধরে ভেসে চলে এক ধরনের স্বপ্ন। যেখানে হারিয়ে যাওয়া যায়। যখন অন্য অর্থে জড়িত শব্দ, অন্য স্মৃতি, ধোঁয়াশার মতো মনেতে। তাঁর গলা বদলে যায়। আর এগিয়ে চলি। জমা হতে থাকা অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে। ভাবতে থাকি তাঁর কণ্ঠস্বরের গান। আর মারা গেলে তাঁরা হারিয়ে যান। কীভাবে যন্ত্রণাকে, ভালোলাগাকে বর্ণনা করে, তারপর পেছনে ফেলে চলে যান।
মেরুদণ্ডের গভীরে স্ট্রীট লাইটের আলো জ্বলতে থাকে, কিছুক্ষণের জন্য রাস্তা আলোয় ছিল।
19/4/2026
Amitava Mukherjee
Reading: Antara Das
Illustration: Sumit Sanyal
Branding: Kaushik Bhattacharyya
Copyright@ Amitava Mukherjee
Khub valo laglo pore
Thank you!